মহানন্দে ভাসান চরের রোহিঙ্গারা- নতুন বাড়িতে এ এক নতুন অনুভূতি

বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলামেইল ডেস্ক।
০৬:৪৮:২৪পিএম, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বহুল আলোচিত ভাসানচরে পৌঁছে বেশ আনন্দিত রোহিঙ্গারা।

কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফের ক্যাম্প ছেড়ে ভাসানচরের পরিকল্পিত আবাসন পেয়ে খুশি তারা। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় এই ভাসানচর নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু রোহিঙ্গারা নয়, ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়ার পর আনন্দে দেশের ব্যবসায়ীরাও। তারা এই দ্বীপকে এখন ব্যবসার নতুন এক ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন। দ্বীপে নতুন জীবন লাভের সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।

১১ বছর ওমানে থাকার পর দেশে ফিরেছেন জাভেদ ইকবাল। আর বিদেশে না গিয়ে পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে ২০১৬ সালে স্বন্দীপে ফিরেন তিনি।

এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী স্থানান্তরের জন্য ভাসান চরে বিশাল নির্মাণ কাজ চলার কথা যখন শুনলেন, তখন জাভেদ কয়েকজন বন্ধু সহ ওই দ্বীপে যান। তখন যেহেতু সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে কোনও বাধা ছিল না।

তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যদি আমি একটা মুদি দোকান খুলতে পারি তবে আমি কিছু উপার্জন করতে পারব। কারণ তখন প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৫ হাজার লোক দ্বীপে কাজ করছিল।’

ভাবনা মতোই কাজ। তিনি মুদি খোলেন এবং ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু প্রকল্পটি শেষ হলে নির্মাণকর্মীরা চলে যায়। জাভেন বলেন, ‘গত এক বছর আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম রোহিঙ্গাদের জন্য, দ্বীপে নতুন জীবন লাভ করার জন্য।’

ভাসান চর বাজারে ৬৩টি দোকান রয়েছে। মুদি দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে মোবাইল সার্ভিসিং শপ, সেলুন, হাঁস-মুরগির দোকান এবং একটি আলাদা কাঁচা বাজার।

দোকান মালিকরা জানান, ভাসান চরের দোকানগুলোর সুবিধা হল তাদের ভাড়া দেওয়ার দরকার হয় না। তারা দোকানগুলো নির্মাণের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন।

হাতিয়া ও স্বন্দীপের দ্বীপগুলোর মতো দোকান মালিকরা চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী থেকে ট্রলারের মাধ্যমে ভাসান চরে পণ্য নিয়ে যান।

নোয়াখালীর সুবর্ণা চর থেকে যাওয়া মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ ২০১৭ সালে একজন দিনমজুর হয়ে ওই দ্বীপে গিয়েছিলেন। তিনি নির্মাণ সামগ্রী লোড এবং আনলোড করতেন এবং এক মাস কাজটি করেন।

তারপরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দ্বীপে তেমন কোনও দোকান নেই বলে একটি সবজির দোকান আয়ের ভালো উৎস হবে। তিনি প্রকল্প কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে একটি ছোট সবজির দোকান খুললেন।

আতিকুল্লাহ’র কথায়, ‘যদিও আমার বাড়ি ভাসান চরের খুব কাছে, তবুও ব্যবসাটি ভালভাবে চলতে থাকায় আমি প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে বাড়িতেই যাইনি।

তিনি প্রতিদিন ট্রলারের মাধ্যমে নোয়াখালী থেকে শাকসবজি নিয়ে যেতেন। আতিকুল্লাহ বলেন, ‘আমার লোকেরা নোয়াখালী থেকে শাকসবজি কিনে ট্রলারে চাপিয়ে দিত। আমি এটি ভাসান চরে রিসিভ করতাম এবং বিকাশের মাধ্যমে আমরা লেনদেন করেছি।’

আতিকুল্লাহ আরও বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যেমন আসতে শুরু করেছে, দিন দিন ব্যবসা বাড়বে। দ্বীপের অন্যান্য দোকানদাররাও একইভাবে জনগণের আগমনের সাথে তাদের দ্বীপটির ব্যবসায়িক উন্নতির সম্ভাবনা দেখে উচ্ছ্বসিত। যার ফলে দ্বীপটি নতুন জীবন অর্জন করেছে।

ভাসান চরের মুদি দোকানদার মোঃ রিয়াজ উদ্দিন বলেছেন, দ্বীপটি তাদের চোখের সামনে একটি ছোট্ট শহরে পরিণত হয়েছে এবং এক লাখ রোহিঙ্গা এলে এটি একটি বড় শহরে পরিণত হবে এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে।

তবে তারা আশঙ্কা করছেন যে, রোহিঙ্গারা ব্যবসায় জড়িত থাকলে তারা সম্ভবত কোণঠাসা হতে পারেন। কারণ এখন রোহিঙ্গারা দ্বীপে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

তারা এখন পরিস্থিতি সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অন রেকর্ডেও কিছু বলতেও চায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ইংরেজি দৈনিককে এক দোকানদার বলেছিলেন, ‘আমরা গত তিন বছরে জনগণকে সেবা দিয়েছি। আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি তবে আমরা যদি আবাসন এলাকার অভ্যন্তরে নির্মিত বাজারগুলোতে বরাদ্দ না পাই তবে হতাশই হবো।’

আশ্রয়ণ -৩ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (ভাসান চর প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম) কমোডর এএ মামুন চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, যারা আগে সেবা দিয়েছিলেন এবং বিদ্যমান বাজারে দোকান রয়েছে তারা আবাসন এলাকার অভ্যন্তরের দোকানে অগ্রাধিকার পাবেন।

তিনি বলেছিলেন যে, এই লোকেরা যেকোনও জরুরি পরিস্থিতিতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এর মতো কাজ করেছে এবং তারা শুরু থেকেই এই প্রকল্পের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

‘রোহিঙ্গাদের ব্যবসায় জড়িত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই’ বলেও জানান মামুন চৌধুরী।

আবাসন এলাকার অভ্যন্তরে দুটি বাজার ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে এবং অপরটির নির্মাণ কাজ চলছে। যারা বিদ্যমান বাজারে ব্যবসা করছেন তারা সেখানে অগ্রাধিকার পাবেন বলেও জানান কমোডর এএ মামুন চৌধুরী।