এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় এলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

জাতীয়
সালমান খান।
০৯:০৩:৪৪এএম, ১ মার্চ, ২০২১

অগ্নিঝরা মার্চ যেন চিরভাস্মর বাঙালির মনে প্রানে। বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ ই মার্চের ভাষণ আজও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের সকল বাঙ্গালির মনেপ্রাণে। 

চার যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এ দেশের জনগণের জীবনে এতটুকু ফিকে হয়নি মার্চের গৌরবগাথা। একাত্তরের এই মার্চে মুক্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে এই মার্চ দিয়েছে গৌরবদীপ্ত মুক্তিযুদ্ধের আস্বাদ।

এ মাসেই উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। পঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার ইশতেহার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মহাকাব্য রচনা করেছিলেন বাঙালির হাজার বছরের অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষার এই পঙ্‌ক্তিমালা উচ্চারণ করে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি- বাঙালি আর পরাধীন নয়।

আজ থেকে শুরু হচ্ছে আবারও সেই অগ্নিঝরা মার্চ। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। বাঙালিরা প্রত্যাশা করে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হবে। কিন্তু নির্বাচনের প্রায় আড়াই মাস পর ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় বাঙালি বুঝতে পারে, এ অঞ্চলের মানুষকে কখনোই শাসনভার নিতে দেবে না পাকিস্তানি শোষকের দল। ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তারা।

পহেলা মার্চেই মতিঝিল এলাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মিছিল নিয়ে সমবেত হয় বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ। স্লোগান ওঠে- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ বঙ্গবন্ধু এক মুহূর্ত দেরি না করে এ বৈঠক থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ২ ও ৩ মার্চ দেশব্যাপী টানা হরতালের কর্মসূচিও ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করে।

৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ব্যাপক কর্মসূচি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মঞ্চে উঠে দৃপ্তকণ্ঠে যার যা আছে, তাই নিয়ে চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানানোর সেই মুহূর্তকে অনন্য ছন্দময় বর্ণনায় তুলে ধরেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ- “শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/ হৃদয়ে লাগিল দোলা-/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার, সকল দুয়ার খোলা-/ কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি :/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার পর পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা বুঝে যায়, আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয় বাঙালিকে। তাই ২৫ মার্চের কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝঁপিয়ে পড়ে বর্বর ও হিংস্র পাকিস্তানি সেনারা। শুধু ঢাকাতেই হত্যা করে এক লাখের বেশি মানুষকে। গ্রেফতার করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে গ্রেফতারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের।

অগ্নিঝরা মার্চকে স্মরণ করতে মাসজুড়েই বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পেশাজীবী সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে।

এই মার্চে পালিত হতে যাচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। আজ মার্চের প্রথম দিনেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার শপথ নিতে হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সার্থক করতে হবে।