দেশের অর্থনীতি কোথায় সঞ্চয়পত্র ভেঙে সংসারে

ডেস্ক এডিটরডেস্ক এডিটর
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:২৬ AM, ১৯ জুলাই ২০২০

বাংলামেইল ডেস্ক
দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এপ্রিল-মে মাসে বিনিয়োগের চেয়ে টাকা তুলে নেওয়ার পরিমাণ ছিল বেশি গত অর্থবছরে ১১ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ৭৬%
২০১৮ সালে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক জাতীয় সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল হালিম। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর সাধারণ ছুটিতে তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এত দিন ব্যবসার পুঁজি ও জমানো টাকায় সংসার কোনোমতে চললেও কয়েক মাসের বাসা ও দোকান ভাড়া জমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে গত ৮ জুন মেয়াদ পূর্তির ১১ মাস আগেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলেন। ষাটোর্ধ্ব আবদুল হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০-২৫ বছর ধরে শান্তিনগর বাজারে ব্যবসা করছেন। কখনোই এত দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতিতে তিনি পড়েননি। আবদুল হালিমের মতো দেশের বেশির ভাগ মানুষের আয়ে কোপ বসিয়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। অনেকে হয়ে পড়েছেন কর্মহীন ও বেকার। আবার কারো চাকরি থাকলেও বেতন পাচ্ছেন না। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় ঠিকই করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের খরচ মেটাতেই এখন হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। ব্যবসার পুঁজি ও জমানো সঞ্চয় ভেঙে চলছে বেশির ভাগ মানুষের সংসার। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, জীবিকা নির্বাহে মানুষ মেয়াদ পূর্তির আগে কিংবা মেয়াদ পূতির্তে সঞ্চয়পত্রের টাকা তুলে নিচ্ছেন।

বর্তমানে অন্য যেকোনো উেসর চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি। এতে স্বাভাবিকভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে ঠিক উল্টো। প্রতি মাসেই কমছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। সর্বশেষ মে মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৩০ কোটি টাকার, যা গত বছরের মে মাসের তুলনায় প্রায় সাত গুণের কম। গত বছরের মে মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল তিন হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭৬ শতাংশ।
কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছিল। তবে লাগাম টানতে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে বেশ কিছু শর্ত ও বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। এর পর থেকে কমতির দিকেই ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। তবে ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংক আমানতে সুদ ৬ শতাংশ কার্যকরের ঘোষণা আসায় ফেব্রুয়ারির পর থেকে আবার সঞ্চয়পত্রমুখী হতে শুরু করেছিল মানুষ। কিন্তু মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ায় এতে আবার ভাটা পড়তে শুরু করে।

গত মার্চ থেকে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর স্থবির হতে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের চাকা ছিল প্রায় বন্ধ। এতে অনেকেরই আয় রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন অনেকেই। অনেকের কাজ থাকলেও বেতন বন্ধ আছে। এখন সব কিছু খুললেও সংক্রমণ না কমায় এখনো গতিহারা অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন তাঁদের সঞ্চয় ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এর ফলে এপ্রিল ও মে মাসে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের চেয়ে টাকা তুলে নেওয়ার পরিমাণ বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। অনেকেই বলছেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না এলে আগামী দিনে সঞ্চয়পত্র থেকে টাকা তুলে নেওয়ার হার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা হলে চলতি অর্থবছরে বিক্রির লক্ষ্য অর্জন হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বিক্রি কমতে থাকায় পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ধরা হয়। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর জুলাই থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এই ১১ মাসে মোট ৫৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে মূল বা আসল পরিশোধ হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। মূল অর্থ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসাবে ওই ১১ মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ ১১ হাজার ১১ কোটি টাকা। কিন্তু আগের অর্থবছরের (২০১৮-১৯) একই সময়ে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা এবং নিট বিক্রি ছিল ৪৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগের অর্থবছরের তুলনায় সদ্যঃসমাপ্ত (২০১৯-২০) অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে ৭৬.৪৩ শতাংশ।

ওই সব প্রতিবেদন অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে চলতি বছরের মে মাসে মোট তিন হাজার ২২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আসল পরিশোধ করা হয়েছে দুই হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে নিট বিক্রি দাঁড়ায় মাত্র ৪৩০ কোটি টাকা। আগের মাস এপ্রিলে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ধারায়। ওই মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৬৬১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে একই মাসে আসল পরিশোধ তথা সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৬ কোটি টাকা। অথচ মার্চ মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল পাঁচ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা।
এর বিপরীতে মূল পরিশোধ করা হয় চার হাজার ৮৭ কোটি টাকা। ফলে নিট বিক্রি হয় এক হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। তার আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি ছিল ছয় হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ওই মাসে মূল পরিশোধ হয় চার হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। ফলে ওই মাসে নিট বিক্রি ছিল এক হাজার ৯৯২ কোটি টাকা।

আপনার মতামত লিখুন :